Sunday, March 29, 2026

‘সেই ফুটবল ছিল ধ্রুপদি সংগীতের মতো, এখনকার ফুটবল যেন শুধুই ধুপধাপ শব্দ’

 

আলেকজান্দ্রে পাতো
আলেকজান্দ্রে পাতোপাতোর ইনস্টাগ্রাম

২০০৭ সালের গ্রীষ্মের কথা। দুরু দুরু বুকে এসি মিলানের ড্রেসিংরুমে পা রাখল ১৭ বছরের এক ব্রাজিলিয়ান কিশোর। আলেকজান্দ্রে পাতো তার নাম।

নিউইয়র্কের এক ক্যাফেতে বসে দ্য অ্যাথলেটিকের সঙ্গে আলাপচারিতায় পাতো ফিরে যান ১৯ বছর আগের সেই সময়ে, ‘ড্রেসিংরুমে আমার ডান দিকে বসা পাওলো মালদিনি। সামনে তাকাতেই দেখি কাকা ও রোনালদো। পুরো দলটাই তো কিংবদন্তিতে ঠাসা। যাঁদের নিয়ে সারা জীবন প্লে-স্টেশনে খেলেছি, তাঁরাই তখন আমার রক্ত-মাংসের সতীর্থ!’

আরও পড়ুন

মিলানের মেডিকেল সেন্টারে পাতোর সঙ্গে দেখা করতে এলেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে গেলেন ক্লাবের ডাইনিং হলে। সেই ঘরে তখন তারার মেলা। মাত্র দুই মাস আগেই এই দলটি জিতেছে চ্যাম্পিয়নস লিগে সপ্তম শিরোপা। নেস্তা, মালদিনি, পিরলো, সিডর্ফ, গাত্তুসো থেকে শুরু করে ইনজাগি আর রোনালদো নাজারিও—কে নেই সেখানে! কাকা তো সে বছরই জিতলেন ব্যালন ডি’অর।

২০১০-১১ মৌসুমে সিরি ‘আ’ জয়ী দলে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন পাতো
২০১০-১১ মৌসুমে সিরি ‘আ’ জয়ী দলে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন পাতো
পাতোর ইনস্টাগ্রাম

পাতোর চোখে তখন বিস্ময়, ‘আনচেলত্তি আমাকে দেখেই সবাইকে দাঁড়াতে বললেন। একে একে সব মহাতারকা এসে আমাকে স্বাগত জানালেন। বুঝলাম, একেই বলে সম্মান। আপনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হতে পারেন, কিন্তু আপনাকে বিনয়ী হতে হবে।’ পাতো এখনো মনে করেন, মিলানে ফুটবল শুধু খেলা ছিল না, দলটা ছিল একটা পরিবারের মতো। আর সেই পারিবারিক বন্ধনই তাদের সব জিতিয়েছিল।

আরও পড়ুন

কিন্তু পাতোর মিলানের সেই উচ্চতা ছুঁতে পারেননি খুব একটা। একসময়ের ব্রাজিলিয়ান সেনসেশন ক্যারিয়ারজুড়েই ভুগেছেন চোটে। বিশেষ করে হ্যামস্ট্রিং চোট তাঁর অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বারবার। ক্যারিয়ারে ৫০০ ম্যাচে ১৮৯ গোল, পরিসংখ্যানটা একেবারে মন্দ নয়। কিন্তু ১৭ বছরের সেই কিশোরকে ঘিরে যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিল, তার ধারেকাছেও তো যেতে পারেননি। মিলানে ছয় বছর কাটিয়েছেন। ২০১০-১১ মৌসুমে সিরি ‘আ’ জয়ী দলে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন—১৪ গোল। এতটুকুই তো! চেলসি, ভিয়ারিয়ালে ব্যর্থ হয়ে চীনেও যেতে হয়েছে খেলতে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ফিরেছেন নিজের দেশের ক্লাব সাও পাওলোতে। কোথাও আসলে ওই অর্থে আলো ছড়াতে পারেননি।

এখন পাতোর বয়স ৩৬। ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন বছর তিনেক হয়ে গেছে। কিন্তু সেই শিশুসুলভ হাসি আর চোখের চঞ্চলতা এখনো আগের মতোই। কথা বললেন এখনকার ফুটবল নিয়ে। এই ডেটানির্ভর ফুটবল ও কোচিংয়ের যুগে রোনালদিনহো বা রোনালদোর মতো শিল্পীরা কীভাবে মানিয়ে নিতেন? পাতোর হাসিটাই উত্তর, ‘আপনি কি রোনালদিনহোকে বলতে পারতেন—এই রনি, প্রতিপক্ষের ৮ নম্বর খেলোয়াড়কে মার্ক করো? ও তো হেসেই উড়িয়ে দিত! রোনালদোকে যদি বলতেন ডিফেন্ডারদের প্রেসিং করতে, ও বলত—তোমরা বল কেড়ে আমাকে দাও, বাকিটা আমি দেখছি।’

সম্প্রতি মিলানের দূত হয়ে নিউইয়র্ক ঘুরে এসেছেন পাতো।
সম্প্রতি মিলানের দূত হয়ে নিউইয়র্ক ঘুরে এসেছেন পাতো।
পাতোর ইনস্টাগ্রাম

সম্প্রতি মিলানের দূত হয়ে নিউইয়র্ক ঘুরে এসেছেন পাতো। কথা বলেছেন হাজারো শিক্ষার্থীর সঙ্গে। হার্লেমের সাকসেস একাডেমিতেও গেছেন, যেখানে ২০২১ সাল থেকে মিলান ফাউন্ডেশন সহায়তা দিয়ে আসছে। ৬ থেকে ১৮ বছরের ৪৫০ ছেলেমেয়ে পড়ে সেখানে, যাদের ৮৫ শতাংশই আসে স্বল্প আয়ের পরিবার থেকে। জীবনের চড়াই-উতরাই থেকে কীভাবে শিক্ষা নিতে হয়, সেই গল্প শুনিয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের।

আরও পড়ুন

পাতোর বেড়ে ওঠা ব্রাজিলের পাতো ব্রাঙ্কোতে। একেবারে ছোটবেলায় খেলার জন্য বলও ছিল না তার। আলু বা কমলা নিয়ে ড্রিবলিং করতেন। ১১ বছর বয়সে প্রথম আসল ফুটবল পায়ে নেওয়া ছেলেটি ১৭ বছর বয়সেই পৌঁছে যায় মিলানে।

মাঝের গল্পটাও রোমাঞ্চকর। টিনেজার বয়সেই ঘর ছেড়ে ইন্টারনাসিওনালে যোগ দিলেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে পালমেইরাসের বিরুদ্ধে অভিষেক, মাঠে নামার এক মিনিটের মাথায় গোল! তারপর জাপানে ক্লাব বিশ্বকাপে মিসরের আল আহলিকে হারানো, বার্সেলোনার বিপক্ষে ফাইনাল। চ্যাম্পিয়নের ট্রফি নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন, সঙ্গে বোনাস—রোনালদিনহোর বার্সা জার্সি!

নিজের আইডল কিংবদন্তি রোনালদোর সঙ্গে পাতো।
নিজের আইডল কিংবদন্তি রোনালদোর সঙ্গে পাতো।
পাতোর ইনস্টাগ্রাম

কয়েক মাসের মধ্যে ব্রাজিলের ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ। জনপ্রিয় পত্রিকা প্লাকার লিখল—‘ব্রাজিলীয় ফুটবলের নতুন সেনসেশন’। চেলসি, আর্সেনাল, লিভারপুল, বার্সেলোনা, জুভেন্টাস, ইন্টার—কত ক্লাব আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু পাতো বেছে নিলেন মিলান। কারণ? রোনালদোর প্রতি ভালোবাসা।

আরও পড়ুন

ব্রাজিলে কেউ ভালো খেললেই তকমা জোটে—‘নতুন পেলে’ বা ‘নতুন রোনালদো’। মিলানে যোগ দিয়ে পাতোকেও শুনতে হয়েছিল—‘এই হলো পরের রোনালদো।’ দ্য অ্যাথলেটিকের সঙ্গে গল্প করতে করতেই বললেন, ‘আমি কখনোই নিজেকে নতুন রোনালদো ভাবিনি। শুধু মনে হতো, ভালোবাসা থেকে খেলছি। আর পাশে বিশ্বের সেরারা আছেন। ব্রাজিলে কেউ একটু ভালো খেললেই বলে, ওই দেখো, নতুন কেউ এসে গেছে। এটা চাপ নয়, এটা স্বাভাবিক।’

ব্রাজিলের হয়ে নিজেকে ঠিক মেলে ধরতে পারেননি পাতো।
ব্রাজিলের হয়ে নিজেকে ঠিক মেলে ধরতে পারেননি পাতো।
পাতোর ইনস্টাগ্রাম

মাঠের বাইরেও তখন বেশ আলোচনায় ছিলেন পাতো। একজন ব্রাজিলিয়ান অভিনেত্রীকে বিয়ে করেছিলেন, রিসেপশন হয়েছিল রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা প্যালেসে। কিন্তু সে সম্পর্ক টেকেনি। পরে প্রেম হয়েছিল ইতালির তখনকার প্রধানমন্ত্রী ও মিলানের মালিক সিলভিও বের্লুসকোনির মেয়ে বারবারা বের্লুসকোনির সঙ্গে। আড়াই বছর টিকেছিল সেই প্রেম।

মাঠের বাইরের রঙিন জীবন আর চোট—দুইয়ে মিলে পাতোর ক্যারিয়ারের ছন্দপতন ঘটে। মিলানে থাকতেই চোট পেয়েছেন ১৬ বার। ‘মানুষ শুধু ম্যাচটা দেখে, সুস্থ হওয়ার দীর্ঘ লড়াইটা অজানাই থেকে যায়। বারবার চোটে পড়ে একসময় নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম, আক্ষেপ পাতোর কণ্ঠে। এখন তিনি উত্তরসূরিদের সচেতন করতে চান। চুক্তিপত্র বোঝা, নিজের ব্যাংক–ব্যালান্সের খবর রাখা বা এজেন্টকে চেনা—সবই তাঁর চোখে ভীষণ জরুরি।

আরও পড়ুন

ফুটবলের বদলে যাওয়া নিয়ে বলতে গিয়ে যেন আবার নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে ফিরে যান পাতো। ২০১৮ সালে পিরলোর বিদায়ী ম্যাচে টট্টি, দেল পিয়েরো, তেভেজদের সঙ্গে খেলেছিলেন। পাতো বললেন, ‘সেই ফুটবল ছিল ধ্রুপদি সংগীতের মতো। আর এখনকার ফুটবল যেন শুধুই ধুপধাপ শব্দ! এখন মাঠে নাম্বার টেন ভূমিকায় কোনো খেলোয়াড়ই তো নেই। শুধু প্রতিভা দিয়ে এখন আর টিকে থাকা সম্ভব নয়, এখনকার খেলা অনেক বেশি শারীরিক। কোচের কথা না শুনলে দলের বাইরে।’

সামনেই বিশ্বকাপ। ব্রাজিলিয়ান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এসবিটির হয়ে সেই টুর্নামেন্টে ধারাভাষ্য দেবেন পাতো। ব্রাজিলের ডাগআউটে থাকবেন তাঁর প্রিয় কোচ ও বন্ধু কার্লো আনচেলত্তি। পাতোর খুব আশা ব্রাজিলকে নিয়ে, ‘কার্লো জানেন তারকাদের কীভাবে সামলাতে হয়। ব্রাজিলের জন্য তিনিই সঠিক মানুষ।’

ব্রাজিলিয়ান সতীর্থ মার্সেলোর সঙ্গে পাতো।
ব্রাজিলিয়ান সতীর্থ মার্সেলোর সঙ্গে পাতো।
পাতোর ইনস্টাগ্রাম

তবে নেইমার প্রশ্নে একটু থামলেন। বেশ বাস্তববাদী শোনাল তাঁর কণ্ঠ, ‘আমার বন্ধু নেইমারকে ভালোবাসি। তবে এটা কার্লোর চেয়ে ওর (নেইমারের) নিজের ওপর বেশি নির্ভর করছে। বিশ্বকাপের আগে শতভাগ ফিট হওয়ার সময় আছে। কিন্তু ব্রাজিলে খেলাটা সহজ নয়।’ নেইমার না থাকলে রাফিনিয়া, ভিনিসিয়ুস আর কুনিয়ার ওপরই ভরসা রাখবেন পাতো।

ব্রাজিল কি তবে শৈল্পিক ফুটবল ছেড়ে ইতালিয়ান ঘরানার রক্ষণাত্মক ফুটবলে ঝুঁকবে? পাতোর উত্তর, ‘নতুন প্রজন্মের সমর্থকেরা বোঝে যে এখন আর রূপকথার ফুটবল খেলা সম্ভব নয়। খারাপ খেলো, তবু জেতো—এটাই এখন ব্রাজিলের চাওয়া। আমরা শুধু চাই ব্রাজিল ফাইনালে পৌঁছাক।’

ফুটবল মাঠে অনেক কিছু পাননি পাতো—বিশ্বকাপের মঞ্চ, কিংবদন্তির তকমা। কিন্তু যা পেয়েছেন, তার মূল্য হয়তো কোনো ট্রফিতে মাপা যায় না।

নিজেকে চিনতে শিখেছেন। এটুকুই তাঁর কাছে যথেষ্ট।



শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.